ইতিহাসের অমর বিপ্লবী মাষ্টারদা সূর্য সেন




তারা বিশ্বাস করত – বৃটিশদের রাজত্বে কোনোদিন সুর্য অস্ত যায়না’’। শক্তি ও
সামর্থ্য বোঝাতে বৃটিশরা এই কথা ব্যবহার করত। কিন্তু তত্কালীন ভারতীয় উপমহাদেশে যে মানুষটি প্রথম বৃটিশদের এই অহমিকায় ঘা দিতে পেরেছিলেন তিনি মাষ্টারদা সুর্য সেন। ১৯৩০ সালের শুরু থেকে আসকার খাঁর দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত কংগ্রেস অফিসে সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী ভবিষ্যৎএর সশস্ত্র বিপ্লবের রুপরেখা নিয়ে বিভিন্ন নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনার পর ঠিক করেন শুধু শহর না, বরং বিভিন্ন গ্রাম এবং কক্সবাজার থেকেও বিপ্লবীদের নেয়া হবে।আইরিশ রিপাব লিকান আর্মির বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চিটাগাং ব্রাঞ্চ”। বাংলায় “ভারতীয় প্রজা তান্ত্রিক বাহিনী, চট্টগ্রাম শাখা”। আইরিশ বিপ্লবের ধাঁচে একটা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।সকলের মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে জালালাবাদ যুদ্ধ, পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ইত্যাদি সহ সকল অপারেশন ও দল গড়ে তোলা হয়েছিল একটি সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর আদলে কিন্তু তার সাথে ছিল মৃত্যুপণ দেশপ্রেমে পাগল প্রজন্ম।
ইংরেজ প্রশাসন সূর্য সেনকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা অব্যাহত রাখে। তাঁহাকে ধরায়ে দেয়ার জন্য গভর্নমেন্ট দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা করেছিল।পৃথিবীর সব দেশে সব জাতিতে সব দলে সব ধর্মে মীরজাফর , মোশতাক, বেইমান এর বাস, সূর্যসেনের এত সাবধানতা আর সতর্কতার পরেও দালালদের জন্যে তাকেও ধরা পড়তে হলো। সূর্য সেন গৈরলা গ্রামে ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। ১৯৩৩ সালে সেখানে এক বৈঠকে ছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাসগুপ্ত। ব্রজেন সেনের ভাই নেত্র সেন সূর্য সেনের উপস্থিতির খবর পুলিশকে জানিয়ে দেয়। রাত এর দিকে পুলিশ আর সেনাবাহিনী ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। গুলি বিনিময় করে অনেকে পালিয়ে যেতে পারলেও অস্ত্রসহ সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেন ধরা পড়েন। সূর্য সেন গ্রেফতার হবার পর তারকেশ্বর দস্তিদার দলের নেতৃত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালের ১৮ই মে আনোয়ারা থানার গহিরা গ্রামে পুলিশ আর মিলিটারীর সাথে সংঘর্ষের পর তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্ত গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারী মধ্যরাতে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসী কার্যকর হবার কথা উল্লেখ করা হয়। সূর্যসেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মমভাবে অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা হাতুরী দিয়ে পিটিয়ে তাঁদের দাঁত এবং হাড় ও ভেঙ্গে দেয়। পরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। মৃত্যুর পর সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তি দারের লাশ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি কিংবা হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী না পুড়িয়ে লাশদুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজার “The Renown” এ তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গা তে ফেলে দেয়া হয়।
“রেখে যাবার মত একটি জিনিসই আমার আছে তাহল আমার স্বপ্ন, জানি না আরদ্ধ কাজ সফল করার পথে কতটা এগিয়ে যেতে পারলাম… যদি লক্ষ্যে পৌছাবার আগে মৃত্যুর শীতল হাতে তোমাকেও স্পর্শ করে তবে আরব্ধ কাজের দায়িত্ব তোমার উত্তর সুরীদের হাতে অর্পণ করো..”..”বলেছিলেন সূর্যসেন ! বাঙালি যুগে যুগে সে দায়ীত্ব কাধে বহে নিয়ে গিয়েছে, এখনো যাচ্ছে। বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দো লন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সুতিকাগার লাল দিঘী ময়দান। ঐতিহাসিক এ লালদিঘীর চারপাশকে সূর্য সেন স্কয়ার হিসেবে নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ২০১৫তে। সূর্যসেনের স্মৃতি অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের স্মৃতি প্রজন্মে প্রজন্মে ধরে রাখার জন্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের রাজনৈতিক সংগঠনগুলির আরো অগ্রণী ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা ছিল। বহি র্বিশ্বে হলে বৃটিশের হাত থেকে তত্কালীন ভারতীয় উপমহাদেশ কে মুক্ত করে দেশ স্বাধীন করার আন্দোলন, বীর যোদ্ধাদের ত্যাগ, তার ইতিহাস শুধু পাঠ্য পুস্তকে পাঠ্যই থাকত না, তাদের বাড়ি ঘর সহ যাবতীয় তথ্যাদি ফাসি মঞ্চ স্মৃতি ফলক জাদুঘর হিসাবে পর্যটনের দায়িত্বে জনসাধারনের ও ইতিহাস প্রেমী বিদেশী দের জন্যে উপযুক্ত মর্যাদা সহকারে সরকারী উদ্যোগে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হত, যা আমরা এখনো পারি ।রাউজানে সূর্যসেনের ভিটামাটির কি অবস্থা আমার জানিনা, তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তার একমাত্র বংশধর যতীনসেন অনেক যুদ্ধ শেষে গত বছর দেশ ছেড়েছেন !বাংলাদেশে সূর্য সেন কে নিয়ে কোনো নাটক বা থিয়ে টার হয়নি, হয়নি সিনেমাও। বলিউডে ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন নিয়ে খেলে হাম জি জান সে শীর্ষক একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে, যার প্রধান চরিত্র মাস্টার দা সূর্য সেন। ২০১০ সালের ৩ ডিসেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত এই ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড তারকা অভিষেক বচ্চন।মাস্টার দার সহযোগী বিনোদবিহারী চৌধুরী বেচে থাকতে একটি তথ্যচিত্র নির্মান করেন এ.এম আব্দুল্লাহ আবু, নেপথ্যে কন্ঠও দিয়েছেন তিনি, যারা আগ্রহী তাদের জন্যে নিচে লিঙ্কে এই ডকু মেন্টারি, একটি মূল্যবান সংগ্রহ হয়ে থাকবে তা নিশ্চিত ………………………….. সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী বাংলাদেশ




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*