মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের নীরব কান্নার দেশ আমেরিকা




আমেরিকা, যেখানে সারা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে গত দু’শ বছরে বহু জাতির মানুষ গিয়ে এখন হয়েছে প্রায় ৩২৮ মিলিয়ন আমেরিকান। এখনও পৃথিবীর বহু দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ আমেরিকা যেতে পাগলপারা। কারণ তারা মনে করেন, আমেরিকা মানে মহাশক্তিধর দেশ, উন্নত ধনী দেশ; আমেরিকা মানে ডলারের দেশ, পৃথিবীর মুরুব্বি দেশ, সারা পৃথিবীতে খবরদারী করবার দেশ।

বেশ কয়েক বছর আগে এক আরবি বন্ধু আমেরিকা ঘুরে এসে বলেছিলেন, ‘আমেরিকা হল খুব ধনী আর খুব গরীবের দেশ। ওখানে একদিকে সম্পদশালী মানুষ, অন্যদিকে পথে ঘুমায়, ভিক্ষা করে এমন মানুষ নজরে পড়ে। ওখানে মাঝামাঝি থাকার উপায় নাই। ওখানে ইক্বতেসাদ (অর্থ ব্যবস্থা) অমন যে, হয় হিরো নয়তো জিরো’।

বন্ধু হেলাল মহিউদ্দিনের শেয়ার করা ভিডিও ‘পভার্টি ইন ইউএসএ’ দেখছিলাম কাল। তিনি দুদিন আগে কানাডা থেকে স্বদেশে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি-তে জয়েন করেছেন। ভিডিওটি ডয়চে ভেলে-র ডকুমেন্টারি। রাস্তায় গাড়ীতে ঘুমান এমন আমেরিকানদের নিয়ে ডকুমেন্টারি। বাড়ি কেনা দূরে থাক, ভাড়াবাড়ি নেয়ার সাধ্য নাই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের।

আল জাজিরা-র ডকুমেন্টারিতে দেখলাম, লস এঞ্জেলসে প্রায় ১০ হাজার আমেরিকানদের কারো জামাই নাই, তাই বাড়ি নাই। রেন্ট বেশি বলে ভাড়া নেয়া সম্ভব না। ক্যাফেটেরিয়া থেকে লেফ্ট অভার (উচ্ছিষ্ট) খাবার এনে খাচ্ছেন অনেকে। বিনামূল্যে চিকিৎসা নিতে ভিড়। গাড়িতে পোর্টেবল টয়লেট আছে। পশ্চিম উপকূলীয় শহরগুলোতে—সানফ্রান্সিসকো, ক্যালিফোর্নিয়ায় সপরিবারে গাড়িতে থাকেন আমেরিকার গৃহহীন মানুষ। সিয়াটলে গাড়ি ভাড়া নেন বাড়ির বদলে। কারো দুই বছর আগে সুন্দর ভিলা ছিল, সাজানো সংসার ছিল। বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। ৪৫ বছরের নারী হয়ে যান রাস্তার মানুষ।

প্রায় ১০০ মিলিয়ন মানুষ দরিদ্রসীমার নীচে। মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের নীরব কান্নার দেশ আমেরিকাতে ১৯৬৪-র নির্বাচনে জিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন বলেছিলেন, ‘আনকন্ডিশনাল ওয়ার অন পভার্টি ইন আমেরিকা’। কিন্তু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকছে আর আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করতে করতে ফানা-ফানা। যুদ্ধের জন্যে কর্জ করে ২০১৯ সালেই প্রতিদিন খরচ করেছে ৭ শ মিলিয়ন ডলার।
আমেরিকার মানুষদের মাথায় ঋণের বোঝা প্রায় ২২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বেশি। (পিউরিসার্চ/ফ্যাক্টাংক)

বিশ্বপরিব্রাজক ইউজি কৃষ্ণমুর্তি একবার বলেছিলেন, সারা দুনিয়া ঘুরে তিনি যতো জাত বর্ণের মানুষ দেখেছেন, তাতে তাঁর মনে হয়েছে, মানুষ সব আসলে অভিন্ন। কালচারাল ব্যবধান মানুষগুলোর কেবল বাইরে। ভিতরের মানুষের ব্যবধান নাই। বেঁচে থাকার লড়াই অভিন্ন। বাংলাদেশের গ্রামের দুষ্ট লোকটির সাথে পৃথিবীর সব দেশের গ্রামের দুষ্ট লোকটির মিল আছে। শহরের পাড়ার ছেলেটির মাস্তানি আর বিশ্বব্যাংকের মাস্তানি একই রঙের। পুঁজিবাদের দাস সব লিডারের চরিত্র এক। সব ভাল মানুষও অভিন্ন।

কিন্তু ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়া আমেরিকা ধার করে হলেও মাস্তানি কেন করে? কারণ ডলারই অর্থনৈতিক দুনিয়ার মাস্তান নির্ধারিত। কারণ ডলারই পৃথিবীর রিজার্ভ কারেন্সি। ১৯৪৪ সালে ‘ব্রেটন উডস এগ্রিমেন্ট’ এর মাধ্যমে যায়নবাদীরা এটা নির্ধারণ করে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ চালু করেছিল। যদিও ১৯৭১ এ প্রেসিডেন্ট নিক্সন স্বর্ণের সাথে ডলারের কনভার্টিবিলিটি সাসপেন্ড করায় ব্রেটন উড সিস্টেম অকার্যকর হয়, তবু এর লক্ষ্য ভ্যালিড থাকে। ২০০৮ সালে ইউরোপের পক্ষে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই সারকোজি ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ গোপন আলাপে একমত হয়ে নিউ ফিনান্সিয়েল ওয়ার্ল্ড অর্ডার আকারে যা সামনে আনেন, তা ছিল ব্রেটন উডস সিস্টেমেরই সেকেন্ড ফেইস। ফলে ডলার এক্সচেঞ্জ রেইট ফিক্সড ও স্ট্রং পজিশন থাকলো।
বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের বানানো এই ‘ব্রেটন উডস এগ্রিমেন্ট’-র কারণে পৃথিবীর বেশিভাগ দেশকে আমেরিকাতে পণ্য রপ্তানী করতে হয়। কোম্পানিগুলো এতে প্রচুর ডলার পায়। উল্লেখ্য, ‘China’s currency power comes from its exports to America. এই লাইনে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ব্যবসায়ীদেরকেও বেশি তেল বেচতে হয় আমেরিকার কাছে, নিজেদের কারেন্সি ঠিক রাখতে ডলারের সাথে। ডলার ফল করলে পতন তাদেরও। এই রকম গিট্টু বাঁধা। তবে চীন তলে তলে চাল দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে ইউয়ান হয় আন্তর্জাতিক মাস্তান। মাস্তানি কারো থাকতেই হয়! এই হল মানুষের বুদ্ধির দৌড়!

সূত্র : লস এঞ্জেলস টাইমস, বিজনেস ইনসাইডার, ডয়চে ভেলে, বিবিসি, আল জাজিরা, দ্যব্যালেন্স, পিউরিসার্চ/ফ্যাক্টাংক, টাইম, দ্যক্রিস্টিয়ানসায়েন্সমনিটর।

~ সারওয়ার চৌধুরী




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*