রণাঙ্গনের অকুতোভয় বীর, বাংলা গানের কিংবদন্তী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল




মৃত্যুর আগে গৃহবন্দী থাকার কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন, ‘বন্ধুরা, সরকারের নির্দেশে ২০১২ সালে আমাকে যুদ্ধাপরাধীর ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াতে হয়েছিল। সাহসিকতার সঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে হয়েছিল ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলখানার গণহত্যার সম্পূর্ণ ইতিহাস। ওই গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে আমি একজন। হত্যা করা হয়েছিল একসঙ্গে ৪৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে। কিন্তু এই সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে আমার নিরপরাধ ছোট ভাই মিরাজকে হত্যা করা হবে, তা কখনো বিশ্বাস করতে পারিনি। সরকারের কাছে বিচার চেয়েছি, বিচার পাইনি।’

‘আমি এখন ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারায় গৃহবন্দী থাকি, একমাত্র সন্তানকে নিয়ে। এ এক অভূতপূর্ব করুণ অধ্যায়। একটি ঘরে ৬ বছর গৃহবন্দী থাকতে থাকতে আমি উল্লেখযোগ্যভাবে অসুস্থ।

নামটির সাথে মিশে আছে কথা, সুর, দেশ, মুক্তি, ভালোবাসা আর বুক ভরা ক্রন্দন। আমাদের সঙ্গীত জগতে কথা ও সুরের ঐশ্বর্যে প্রতিভাবান এক সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। একাধারে গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালকসহ অনেক গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিটি মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে রেখে গেছেন অসামান্য অবদান।

১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্ম এই প্রবাদ পুরুষের। আজিমপুরের কলোনিতে বাবা ওয়াফিজ আহমেদ ও মা ইফাদ আরা নাজিমুন নেসার সংসারে খুব দুরন্তপনায় কাটছিল বুলবুলের শৈশব। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি খুব আগ্রহ দেখা যায় তার। বাবার সাথে বাড়িতে বসে রেডিও শোনা ছিল নিত্যদিনের দিনলিপি। গান শুনতে শুনতে গান গাওয়ার চেষ্টাও শুরু হলো।

গিটার কেনার মাধ্যমে প্রথম বাদ্যযন্ত্র হাতে তুলে নিলেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার ছিল না। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি খুব ভালোবাসতেন তিনি। প্রকৃতিই যেন তার সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুরু। নিজে নিজেই শিখে ফেলেছিলেন গিটার, পিয়ানো ও হারমোনিয়াম। মাত্র তেরো বছর বয়সেই তৈরি করেছিলেন জীবনের প্রথম গান- “ও মন ময়না, আয় ফিরে আয় না।” নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীসহ আরো কয়েকজন মিলে নিজেদের একটি দল গঠন করে পাড়া মাতিয়ে রাখতেন তখন।

কিন্তু হাসিখুশি মাখা শৈশবের দিনগুলো খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি বুলবুলের। এলো ১৯৭১ সাল, দেশজুড়ে শুরু হলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। মাধ্যমিক পড়ুয়া আহমেদ ইমতিয়াজের বয়স ছিল তখন মাত্র পনের বছর। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বড় ভাই টুলটুল যুদ্ধে যোগদান করেন। তখন থেকেই তিনি যেন নিজেকে আর ঘরে বেধে রাখতে পারছিলেন না। দেশ মাকে রক্ষা করার জন্যে মায়ের অনুমতি নিয়ে বন্ধু মানিক ও মাহবুবকে নিয়ে চলে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাকিস্তানি বাঙ্কার খোঁজার উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে জুলাই মাসে বন্ধু সরোয়ারকে নিয়ে ঢাকার নিউমার্কেটের প্রবেশমুখে পাকিস্তানী বাহিনীর গাড়িতে গ্রেনেড হামলা করেন। পরের মাসেই তিনি চলে যান ভারতের আগরতলায় প্রশিক্ষণের জন্যে। সেখান থেকে ফিরে এসে ঢাকায় ফিরে ‘ওয়াই (ইয়াং) প্লাটুন’ নামে গেরিলা দল গঠন করে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি মেজর আবু মুহম্মদ হায়দারের অধীনে ২ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

অক্টোবরের দিকে পুনরায় ভারত যাওয়ার আরো তিনজন সহযোদ্ধাসহ কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝামাঝি চেকপোস্টে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে আটক হন। সেখানে আগেই আটককৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তাদের বন্দী করে রাখা হয়। তার চোখের সামনে আটকে রাখা প্রায় তেতাল্লিশজন মুক্তিযোদ্ধাকে একত্রে গুলি করে মেরে ফেলে রাজাকার ও পাকিস্তানী বাহিনী। পরবর্তীতে তাকে মেরে না ফেলে কথা বের করার উদ্দেশ্যে ঢাকার রমনা থানায় স্থানান্তরিত করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন না করে ফিরে আসেন বুলবুল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিবাহিনীর একটি দল তাকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

‘এই দেশ আমার সুন্দরী রাজকন্যা’, ‘উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম’, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেল লাইনের ধারে’, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেবনা’’আমার সারা দেহ খেয়ে ওগো মাটি’,’আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন’, ‘পড়ে না চোখের পলক’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বৌ সাজিয়ে’, ‘জাগো বাংলাদেশ জাগো’ – এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় বাংলা গানের সুর করেছেন যিনি আমাদের আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আক্ষেপ নিয়েই চলে গিয়েছিলেন না ফেরার দেশে।

কিছু কিছু সূর্যোদয় সীমাহীন বেদনার ভার নিয়ে আসে। বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি গত বছর তুমি হারিয়েছ তোমার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজনকে। তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে এ মানুষটির পিঠের চামড়া তুলে নিয়েছিল পাকিস্তানী অমানুষরা, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫।

এই দিনে চলে গিয়েছিলেন রণাঙ্গনের অকুতোভয় বীর, বাংলা গানের কিংবদন্তী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তুমি বেঁচে রবে তোমার সৃষ্টিতে।…………………… Luthful Kabir Rony.




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*