মৃত্যুর পূর্বে কি এক সিলিন্ডার অক্সিজেন পাব -ভাইয়ের মেয়েকে বাঁচাতে একজন ডাক্তারের আকুতি




“মৃত্যুর পূর্বে কি এক সিলিন্ডার অক্সিজেন পাব”- বিএসএমএমইউতে বিএসসি নার্সিংএ অধ্যয়নরত এলাকার পরিচিত এক দাদার মেয়েকে বাঁচাতে একজন ডাক্তারের আকুতি ।

আমি ডাঃ সৌমিত্র রায় সুমিত, মেডিকেল অফিসার হিসেবে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শিবচর, মাদারীপুরে কর্মরত আছি এবং নিষ্ঠার সাথে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। আমার বাড়ি আমার কর্মস্থল থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। সেখানে বাবা,মা সহ অন্য স্বজনেরা উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। একই রকম উৎকন্ঠা তাদের জন্যও কাজ করে।

এই মুহূর্তে কেউ বিপদে পড়লে আমি নিয়ম অনুযায়ী ছুটি পাব না।কারন সরকার আমাদের ছুটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করেছে। কিন্তু এই ভেবে আশ্বস্ত হই যে আমার অন্য ডাক্তার ভাই, বোনেরা এই অভাব দূর করবে। কিন্তু সেই বিশ্বাসে আঘাত লেগেছিল যখন দেখলাম “শহীদ মঈন স্যার” অবহেলার স্বীকার হয়েছিলেন। আজ এই লেখা তাই আমি সম্পূর্ন নির্মোহ হয়ে লিখতে বসেছি। এখানে আমি কারো পক্ষে বা বিপক্ষে বলব না। বাকিটা বিবেচনা পাঠকের হাতে ছেড়ে দিলাম।

“এই মুহূর্তে ডাক্তার, নার্সসহ যত স্বাস্থ্যকর্মী নিঃস্বার্থভাবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের প্রতি রইল শ্রদ্ধা। তাদের কাজের স্বীকৃতি তখনই পাবে যখন কোন রোগী চিকিৎসা সেবা পেয়ে প্রশান্তির হাসি হাসবে। আমি মনে করি রোগীর মুখের হাসির চেয়ে বড় পুরস্কার বা প্রনোদনা চিকিৎসকের কাছে আর কিছু হতে পারে না। হয়ত এভাবে রোগীর মুখে হাসি ফোঁটাতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হই ঘাতক ব্যাধিতে। কিন্তু তারপরও কোন অজুহাতে মুমূর্ষু রোগীর সেবা থেকে আমরা নিজেকে বিরত রাখতে পারিনা। যথেষ্ট সুরক্ষা কবচ নিয়ে রোগীকে সেবা দিতে আমরা বাধ্য। যদিও কতিপয় অর্বাচীন লোকের তথ্য গোপনের কারনে আমাদের অনেক স্বাস্থ্যকর্মী আজ আক্রান্ত। যারা তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিচ্ছে তারা প্রকারান্তরে দেশের সাথেই বেইমানি করছে। এমন চলতে থাকলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অচলাবস্থা বিরাজ করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা নিজেরাও কৃত্রিমভাবে স্বাস্থ্যখাতে অচলাবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই গল্পই এখন বলব।আশা করি এই আত্নসমালোচনাবোধ আমাদের গ্লানি মুক্ত হতে সহায়তা করবে। আমার এলাকার পরিচিত এক দাদার মেয়ে ৪ দিন যাবৎ ফ্লু লাইক সিনড্রোমে ভুগছিল।

প্রথমদিকে জ্বর,গলাব্যাথা, মাথাব্যাথা সহ আরো কিছু কনস্টিটিউশনাল সিম্পটমে ভুগছিল। আমি তখন তাদের মোবাইলে প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দেই এবং বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে বলি। উল্লেখ্য রোগী নার্সিং (বি এস সি), বি এস এম এম ইউ তে অধ্যয়নরত। কিন্তু তারপর রোগীর অবস্থার অবনতি হলে আমি তাদের স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করতে বলি। তারা সেখানে গিয়ে স্যাম্পল দিয়ে বাড়িতে অবস্থান করে। আজ ২৮-০৪-২০২০ তারিখ সকালে তার রেসপিরেটরি ডিসট্রেস আরম্ভ হলে তাদেরকে পুনরায় কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করতে বলি। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লকডাউন থাকায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। কিন্তু তখনো করোনা সনাক্তকরণের রিপোর্ট হাতে এসে না পৌঁছানোর কারনে তারাও রোগী ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। গাজীপুর জেলার সিভিল সার্জন স্যারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি। বলা হল উনি করোনায় আক্রান্ত।যথারীতি তাদের কথামত টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে যোগাযোগ করলাম। তারা ইনজেকশন ডেক্সামিথাসন ও ইনজেকশন ওমিপ্রাজল দিল। কিন্তু রোগী ভর্তি রাখতে অস্বীকৃতি জানায়। আমি কর্তব্যরত ডাক্তারের সাথে কথা বললে তিনি রোগী ভর্তি নিতে অপারগতা জানায়। তারপর আমি RMO র সাথে কথা বলতে মোবাইলে কল দেই।কিন্তু ওনাকে পাওয়া যায়নি। তারপর সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত EMO সাহেবের সাথে কথা বলি। ওনাকে বলি আগামীকাল রিপোর্ট আসবে। আপনি শুধু কয়েক ঘন্টা ভর্তি রেখে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করেন। অনেক অনুনয় সত্তেও তারা ভর্তি নেয়নি। এরপরের কাহিনী আর জানার মতো সাহস হয়নি। এক পিতা তার কন্যাকে নিয়ে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে অক্সিজেনের আশায়। কিন্তু কেউ একটু অক্সিজেন দেয়নি। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল তাকে ভর্তি করেনি রিপোর্ট আসেনি বলে। আর জেনারেল হাসপাতাল তাকে ভর্তি করেনি করোনার সিম্পটমের জন্য। এক পিতার জীবনে এর থেকে বড়ো ট্র্যাজেডি আর কি হতে পারে।

তারপর তারা ঢাকার ছোট বড়ো সব মিলিয়ে ১০ এর অধিক হাসপাতালে ঘুরেছে।তারমধ্যে রয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধী ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মিরপুরের মেটারনিটি হাসপাতাল, মার্কস মেডিকেল কলেজসহ আরো কয়েকটি হাসপাতাল।ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগ করলেও নিরাশ হই। এখনো পর্যন্ত মেয়েটিকে কেউ ভর্তি নেয়নি। অনেকে এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলতে পারে।কিন্তু এটা ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার মাঝে একটা উদাহরন। আমি এখনো বুঝতে পারছি না সমস্ত তথ্য খুলে বলার পরও কেউই তাকে ভর্তি নিল না। আজ যদি এই মেয়েটির কিছু হয় তাহলে তার দ্বায় আমাদের পুরো চিকিৎসক সমাজের। এমন অসহযোগিতা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পেশাগত আচরন বিধি লঙ্ঘনের সামিল। আমি শুধু নির্মোহভাবে বিষয়বস্তু তুলে ধরলাম। বাকিটুকু বিবেচনার ভার পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিলাম।

ডাঃ সৌমিত্র রায় সুমিত, মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শিবচর, মাদারীপুর।




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*