উপমহাদেশের ভাষা আন্দোলন আরেক অধ্যায় ১৯ শে মে শুধু বাংলা ভাষা নয়, বিপন্ন মাতৃ ভাষার জন্য সংগ্রামের মহিমা অর্জন করেছে / পার্থ বসু




উপমহাদেশের ভাষা আন্দোলন আরেক অধ্যায় ১৯ শে মে / পার্থ বসু
একটু পেছন থেকে শুরু করি। আমার স্কুলজীবন , আমার কৈশোর থেকে। আমি তো আজকের শিশুদের মত কিডজি, কেজির ছাত্র না। পাঁচ পাঁচটা বছর খেলেধুলে গ্রামের পাঠশালায় চার বছর কাটিয়ে তবেই বড় স্কুল। হিসেবমত ১৯৬০ সালে আমি ক্লাস ফাইভের ছাত্র। পরের বছর রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষ। আমাদের বাড়িতে সরকারের সুলভ মুল্যের রবীন্দ্র রচনাবলী কেনা হয়েছিল। ওই বছরই , মানে ১৯৬১ র ১৯ শে মে আসামের শিলচরে গুলি চলল। বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনে শহিদ হলেন অনেকে। বাড়িতে যুগান্তর রাখা হত। বাবা কাকারা হেডলাইন পড়তেন। আমি অবশ্য পড়তাম কাফি খাঁর কমিকস।
সিক্সে উঠেই ক্লাসে এক বন্ধু পেলাম। আসাম থেকে এসেছে। তার মুখে জানলাম ওখানে শুরু হচ্ছে বঙ্গাল খেদা। কিছু বন্ধু হারালাম। তারা পাকিস্তান থেকে রিফিউজি হয়ে এসে দামোদরের পাড়ে তাঁবু গেড়ে বাস করছিল। এখন যাচ্ছে দণ্ডকারণ্য। ভাগ্যিস ! ওই রিফুইজিদের একটা ছেলে রয়ে গেলে ওই ফার্স্ট হত ক্লাসে। খুব তুখোড়। খুব জেদি। খুব মেধা।
বাবলু রয়ে গেল। বাবলু অবশ্য শিলচরের না। আপার আসামে থাকতো কোথাও। এখন মনে নেই। বাবলুর ভালো নামটাও মনে নেই।
তবে বাঙালী মার খাচ্ছে পাকিস্তানে , আবার আসামেও। সে বয়সে সে একরকম বুঝেছিলাম।
আসামে প্রথম গেলাম ১৯৮৯ সালে। নাগাল্যান্ড , মোককচং হয়ে। তিনিসুকিয়ায়। গিয়েই চাপে পড়লাম। অখমিয়া ভাষাটু হিখা লাগে। উচ্চারণ আমার অনভ্যস্ত কানে এইরকম ঠেকেছিল। সাইনবোর্ডে অসমীয়ার জয়জয়কার। বর্ণমালা বাংলার মতোই। কোলকাতা তো ইংরেজিতেই ঢাকা। শিলচরে পা রাখলাম আরও এগারো বছর পর। বিমানে উড়ে গিয়ে জুড়ে বসা। তো পাঠক আলাপ সালাপ আসাম আর বরাকের মাটি থেকেই শুরু হোক। বরাক মানে বরবক্র নদ বিধৌত জনপদ। সোনার কাছাড়। কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ঈশান বাংলা।
ভুল ভারতের ভুল আসামে যদিও দুটোই আসাম। আসামের দু প্রান্তের দুটি শহর। তিনিসুকিয়া আর শিলচর। বাংলার অনেক এলাকা নিছক ভূগোলের ফাঁদে আসামে। ব্রিটিশ আমল থেকেই। শিলচরের একটি গল্প দিয়ে বিষয়ে আসি।
করিমগঞ্জের কবি দিলীপকান্তি লস্করের একটি কবিতা পড়ুন
“ আমি কোত্থেকে এসেছি তার জবাবে যখন বললাম
করিমগঞ্জ , আসাম
……………………..
বাংলাভাষার পঞ্চদশ শহিদের ভূমিতে আমার বাস।
তিনি তখন এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থেই
আমাকে ভিরমি খাইয়ে দিয়ে বললেন
ও! বাংলাদেশ ! তাই বলুন।”
বাংলাদেশ আসলে দুভাগ হয় নি। হয়েছে অন্তত তিনভাগ। এটা না বুঝলে ভাষা আন্দোলনের গতি প্রকৃতি কিছুই বোঝা যাবে না। শুধু দুই বাংলা নয়, আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড সহ সারা ভারতে ছড়িয়ে থাকা বাঙালীর ভাষাগত অধিকার সুরক্ষিত ও সংহত করার লক্ষ্যে দুর্বার সংগঠন দেশভাগের পর বিগত আটষট্টি বছরেও আমরা গড়ে তুলতে পারি নি। আর কতদিন ? আর কতদিন ?
***************
আসামে ১৯ শে মে-র ভাষা আন্দোলন একটি স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল হয়ে উঠতে পারে নি। দিশাহীন খুব কঠিন বিশেষণ । কিন্তু দুর্বল নেতৃত্ব এবং ঐক্যবদ্ধ ভাষা আন্দোলনে একটি আত্মঘাতী তথা ভাতৃঘাতী দাঙ্গায় তা কাম্য পরিণতি পায় নি। ব্রিটিশ আমলে গঠিত আসাম নামের রাজ্যটিতে অসমীয়ারা ছিলেন শুরু থেকেই সংখ্যালঘু। তাই রাজ্যের আসাম নামটি ছিল অসমীয়াদের কাছে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে তারা প্রথমে সমগ্র আসামেই বঙ্গাল খেদা শুরু করেন। কারণ বাঙালীরাই ছিলেন আসাম রাজ্যের ভাষিক বিচারে সংখ্যাগুরু। এই বাঙালীদের নিয়ে যে সাম্প্রদায়িক তাস খেলে দেশভাগ সেই একই খেলায় কখনও হাইলাকান্দি। কখনও নেলী। অসমীয়ারা নির্লজ্জ ভাবে খিলঞ্জিয়া খোঁজার নামে সেই একই তাস খেলে যাচ্ছেন আজও।
একটি গল্পের কথা মনে পড়ল। শুনিয়েছেন সপ্তর্ষি বিশ্বাস। আমিও সংক্ষেপে শোনাই।
নাৎসি ক্যাম্পে ইহুদি নিধন চলছে। গ্যাস চেম্বারের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিয়ে আসা হল এক ইহুদী ইঞ্জিনিয়ারকে।। তিনি এক লহমায় খুঁত খুঁজে পেলেন। জানালেন।
তাঁকে জানতে চাওয়া হল ত্রুটি মেরামত করতে সময় লাগবে কত? ইঞ্জিনিয়ার সাহেব দ্রুত দু এক ঘণ্টায় সারিয়ে দিলেন।
কাজ ফুরিয়েছে। ইহুদী মানুষটিকে আর বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন রইল না। সুতরাং—–।
বাঙালীকে সংখ্যালঘু দেখানোর স্বার্থে একদিন যে বাংলা ভাষী মুসলমান চাষি পতিত জমি আবাদ করে সোনা ফলিয়েছিলেন , বন্দুকের মুখে, অসমীয়া সন্ত্রাসের মুখে তাদের বলতে বাধ্য করা হল তাদের মাতৃভাষা বাংলা নয় , অহমীয়া।
কাজ ফুরোলে তারাই পাজী। তারাই খিলঞ্জিয়া। আসামের আকাশে আজ আবার অশনি সংকেত। আমরা , অন্তত কোলকাতার বাঙালীরা, আগের মতোই নির্বিকার।
এই উগ্র আধিপত্যবাদে আসাম রাজ্যটি ভেঙে টুকরো হয়েছে। ১৯ শে মে-র ভাষা আন্দোলন সূচনায় পাশে পেয়েছিল
সমস্ত অনসমীয়া ভাষীকে। স্থানীয় নেপালি , হিন্দুস্থানি , এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ভাষা গোষ্ঠীও সামিল হয়েছিলেন এই আন্দোলনে। সেই অর্থে শিলচরের মাটিতে ১৯ শে মে শুধু বাংলা ভাষা নয় বিপন্ন মাতৃ ভাষার জন্য সংগ্রামের মহিমা অর্জন করেছে। বিশ্বে মাতৃভাষার জন্য শহিদ হয়েছেন যে দুজন মহিলা দুজনই শিলচরের। বাংলাভাষার কমলা ভট্টাচার্য। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার সুদেষ্ণা সিংহ।
তবু ১৯ শে মে-র আন্দোলন আটকে থাকল জিলা স্তরে বাংলা ভাষার সরকারী ব্যবহারে। অন্যান্য জাতি ও ভাষা গোষ্ঠী নিজের নিজের রাজ্য আর রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে আসামের কাছ থেকে। আমরা মেঘালয় , অরুণাচল পেলাম। কিন্তু বরাক বাংলা তার পরম্পরার স্বার্থে একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবীও উত্থাপন করে নি। তারা ভেবেছেন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালীদের স্বার্থের কথাও । বন্দুকের নলের মুখে যারা ভাষিক পরিচয় পাল্টে ফেলেছেন তাদের পাশে পাওয়ার আন্তরিকতায় ঘাটতি ছিল।
২১ শে ফেব্রুয়ারির শহিদের রক্তে একটি রাষ্ট্রের উত্থান হয়েছে। একটি জাতিসত্ত্বার বিকাশ হয়েছে। এমন কি ব্রিটিশ ভারতে ১৯৩৮ এই উগ্র হিন্দি আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহিদ হয়েছিলেন যে তামিলরা , উত্তরকালে আগ্রাসী হিন্দির অশ্বমেধের ঘোড়া দক্ষিণে আটকে ১৯৬৫ তে শহিদ হলেন যে তামিল অস্মিতায় জারিত ভাষা সৈনিকরা তারাও মাতৃভাষার মর্যাদা যে পরাক্রমে রক্ষা করে চলেছেন ১৯ শে মে-র আন্দোলন সেই ব্যাপ্তি পায় নি। পেল না। এটি সমগ্রত “বাঙালীর” ব্যর্থতা। কথাটি আর একটু ভেঙে বলি।
একটি গল্প শুনুন আবার। সন , যতদূর মনে পড়ছে ১৯৭২। সবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি আরও বড় করে উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েছেন রূপনারায়ণের ওপার আর এপারের দুটি মফস্বল বাণিজ্য শহর কোলাঘাট আর বাগনানের বাসিন্দারা। যৌথভাবে। অনুষ্ঠান হচ্ছে বাগনান কলেজে। আমন্ত্রিত বক্তা হয়ে এসেছেন সেই সময়ের খ্যাতনামা গদ্যকার আবদুল জব্বার। বাংলার চালচিত্র লিখে নাম কিনেছেন। সাংবাদিক। জব্বার সাহেবের কিছু লেখা সেই সময়ের নিরিখেও ছিল বিস্ফোরক। যেমন তালাক নিয়ে তার ঘোষণা ছিল কোন উদারমনা হিন্দুর ছেলে পেলে নিজের মেয়েকে তার হাতেই তুলে দেবেন। অন্তত মেয়েটি তালাকের বিপদ থেকে বাঁচবে। ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদের আদলে লিখেছিলেন মৌলবি বনাম বিজ্ঞান জিজ্ঞাসা এইরকম নামের কোন বই। তাতে মৌলবিকে জানতে চাওয়া হয়েছে যাযাবর দস্যুর দেশ বালির তলায় তেলের হদিশ পেল বিজ্ঞান না কোরআন শরীফের পাতায় ? তেল না পেলে তারা আজকের দশায় পৌঁছত কি ? সহজ কথায় জব্বার সাহেবকে আমার একজন সমাজ সংস্কারক মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল তিনি নিজে মুসলিম বলে তাঁর সমাজের ভালো মন্দ নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন। লোকটিকে দেখার কৌতূহল ছিল।
পরিচয়ে দেখলাম কৃষ্ণকায় , খর্বকায় , মাথায় ফেজ আপাত দর্শন এক মৌলবিকে। জানালেন তিনি পাঁচ দফা নামাজ পড়েন নিয়ম করে। ভালো লেগেছিল। তিনি সমাজের মধ্যে থেকেই , মাটিতে দাঁড়িয়েই যা কিছু করতে চান। সে কথা থাক। আমরা তাঁর সেদিনের বক্তৃতার কিছুটা শুনব এখন।
স্মৃতি থেকেই বলছি।
“ আমার নাম আবদুল জব্বার। আমাকে আজ আপনারা ২১ শে ফেব্রুয়ারির এই অনুষ্ঠানে কিছু বলার জন্য ডেকেছেন। কেন ? আপনারা নিশ্চয় আশা করেন অন্যের মত নয় , আমি নিজের মত অন্য কিছু বলব।
তো প্রথমেই বলে রাখি আমার বিদ্যার দৌড় ক্লাস এইট। আমার বাড়ি বজবজ সাতগাছিয়ায়। আমি খুব গরীব ঘরের সন্তান। বাবা চাকরি করতেন জুট মিলে। মিল লক আউট হলে পরের জমিতে জন মজুর। বাবার সাথে আমি জমিতে হাল টেনেছি। আবার মায়ের সাথে লোকের বাড়ি বাসন মেজেছি। পেটের জন্য। তাহলে বুঝতেই পারছেন আমি এক শ্রমিক কৃষকের সন্তান। বাংলা সাহিত্যে গ্রাম নিয়ে যারা লিখেছেন সেই তারাশঙ্কর , বিভুতিভূষণ বা মাণিক সকলেই ব্রাহ্মণ সন্তান। এই প্রথম গ্রাম নিয়ে কেউ লিখছে যে কিনা গায়েগতরে জানে কত ধানে কত চাল। “
একটু গ্রাম্য মনে হচ্ছে? আরও শুনুন।
“ গ্রামের মাটিকে মাটিতে নেমে না চিনলে যা হয়। তারাশঙ্কর তাঁর গল্পে লিখলেন উদয়নাগ ফণা তুলিয়া নাচিতে লাগিল।
তারাশঙ্কর জানতেন না, আপনাদের মত পাঠকও না, উদয়নাগের ফণাই হয় না। ফলে রসভঙ্গ হয় নি। কিন্তু তথ্য প্রমাদ রয়ে গেল।
এই যে হাতে দেখছেন বইটি এটি আমার বাংলা বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ। আমায় দেখতে দেওয়া হয়েছে ঠিক হয়েছে কিনা। বুঝুন কাণ্ড !
ছোটবেলার কথায় আসি। বলেইছি আমি গরীব ঘরের ছেলে। তায় মুসলমান। কথা হল , বাঙালী পাড়ায় দুর্গা পূজা হত।
বাঙালী কথাটি খেয়াল করুন। ওরা বাঙালী , আমি মুসলমান ? কেন? আমি কি বাঙালী নই ? আমি কি বাংলায় কথা বলি না ? তা এই ক্ষোভ চাপা দিয়েই পূজার প্যান্ডেলে যেতাম। প্রসাদ খেতাম। এত আলো আর সাজসজ্জায় হিংসে হত – ইস, আমাদের এত বর্ণ ময় উৎসব নেই। হিংসে হত।”
এবারে জব্বার সাহেব যা বলে বসলেন হোঁচট খেলাম। এতো সাম্প্রদায়িক উস্কানি যাকে বলে !
“ আপনারা জেনে রাখুন একজন মুসলমানের শান্তি একজন হিন্দুর জাত মেরে । আমরা মুসলমান। আপনারা বাঙালী। আমার কি যে আনন্দ হচ্ছে , অবশেষে আমরা আপনাদের সত্যিই জাতে মেরেছি। যে মুসলমানকে আপনারা বাঙালী বলে মানতে চান নি ওপার বাংলার সেই মুসলমানরা আজ জাতি পরিচয়ে বাঙালী। এপারে আপনাদের পরিচয় কি ? বুকে হাত দিয়ে বলুন।”
জব্বার সাহেব এবার আরও ক্ষিপ্ত। আরও ক্রুদ্ধ।
“ ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ছাত্র যুবক প্রাণ দিয়েছে বাংলা ভাষার জন্য। জানতে পারি কি এ বাংলায় মাতৃভাষার জন্য আপনারা কি করেছেন ? একষট্টির শিলচরে বাংলাভাষার জন্য এগারো শহিদের কথা আপনাদের মুখে শুনি না তো ?
এই অনুষ্ঠান করার অধিকার আপনাদের দিল কে ? বক্তৃতা করে এই ঘৃণ্য আত্মপ্রচার আমি সমর্থন করতে পারি না। আমার নিন্দার ভাষা নেই।
ভবিষ্যৎ বক্তার মত বললেন – লিখে নিন। নজরুলকে ওরা নিয়ে গেলেন। নজরুল ফিরে আসবেন না।
জব্বার সাহেব মঞ্চ থেকে নেমে ঝড়ের মত বেরিয়ে গেলেন।
***********************************
বাংলা ভাষার আন্দোলনে অধিকার অর্জন করা সময়ের দাবী। জব্বার সাহেব চোখ খুলে দিলেন। মাতৃভাষা আন্দোলনের সমস্ত শহিদ ও সৈনিকদের স্মরণ করে , আসুন , আমরা শহিদদের পতাকা বহন করার যোগ্যতা অর্জন করি। শপথ নিই আগামীর। বিজয়ের।




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*