ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ারের বড় ভাইয়ের লেখা: ভাইকে ফেরত পাবোনা, সুবিচার পেলে তাঁর আত্মার কিছুটা শান্তি হবে




ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেন এর বড় ভাই এর লেখা : “ভাইকে ফেরত পাবোনা জানি, অন্তত সুবিচার পেলে তাঁর বিদেহী আত্মার কিছুটা হলেও শান্তি হবে” !!
অতি নিম্ন মধ্য বিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। বাবা ছিলেন সরকারের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। আমাদের অল্প আয়ের বাবার পক্ষে দু ভাই তিন বোনের লেখা পড়া ও সংসার চালানো খুবই কষ্ট সাধ্য ছিল। অল্প বয়সে বড়ো বোনের বিয়ে হয়ে যায়। যত দুর মনে পড়ে বোনের বিয়ের তিন বৎসরের মাথায় কঠিন রোগে মায়ের মৃত্যু হয়। আমার বয়স তখন 12 কি 13 ক্লাস সেভেনে পড়ি। বাবা থাকতেন ঢাকায়। তখন আমার ছোট এক ভাই আর দুই বোন নিয়ে সংসার জীবনের সাগরে ভাসতে থাকি। অতি অল্প বয়সে নিজের পড়ালেখা এবং ভাই-বোনদের লেখাপড়ার দায়িত্ব এসে পড়ে আমার কাঁধে।
এইভাবে চলতে থাকে আমাদের সংগ্রামী জীবন। দাদী ছিলেন আমাদের মায়ের মতো। কিছুদিন পর দাদি বাবাকে আরেকটা বিয়ে করিয়ে দেন। আমরা পেলাম নতুন মা। কেন জানিনা অতি অল্প বয়সেই আমার দায়িত্ববোধ টা বেড়ে গেল ভাই-বোনদের প্রতি। নিজের লেখাপড়ার প্রতি যতটুকু যত্নশীল ছিলাম তার চেয়ে বেশি যত্নশীল ছিলাম ভাই-বোনদের লেখা পড়ার প্রতি। আস্তে আস্তে দিন যায় মাস যায় বছর যায়।
আমি যখন দশম শ্রেণীতে আমার ছোটভাই তখন অষ্টম শ্রেণীতে। সেইবার বৃত্তি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মোশারফ হোসেন স্যার। এই খুশির সংবাদে তিনি কতটুকু আনন্দিত হয়েছেন যেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা।
এরপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দশম শ্রেণীতে প্রথম বিভাগে স্ট্যান্ড করেছে। ভর্তি হয় ঢাকার নটরডেম কলেজ। দিন দিন তার সফলতায় আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরো বেড়ে যায়। উচ্চমাধ্যমিকে ভালোভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চান্স পেয়ে যায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে। তখন আমি ঢাকাতে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করি। বাবা থাকে দেশে চাকরির মেয়াদ শেষ।
ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার পাঠ চুকে উঠেছে আমার বাসায়। তখন আমি বিবাহিত। সে আমার বাসায় থাকে আর টিউশনি করে। এরই মধ্যে আমাদের পরিবারের এক বড় ফুফাতো ভাই, উনার মাধ্যমে একটা বিয়ের প্রস্তাব আসে তার। তারা সমাজের সম্মানী ও প্রতিষ্ঠিত পরিবার, এইজন্য আর দ্বিমত করেনি, একদিনেই বিয়ে সম্পন্ন করি।
বিয়ের কিছুদিনের মাথায় তার চাকরি হয়ে যায়। পোস্টিং ছিল ভোলা পৌরসভা। তারপর কিছুকাল নিজের এলাকায় চৌমুহনী পৌরসভা। কয়েকবছর চৌমুহনী পৌরসভায় চাকরি করার পর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা জয়েন করে। প্রতিটি পৌরসভায় অত্যন্ত সুনামের সহিত কাজ করে আসছিল। এরপর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে রূপ নেয়।
সেই সুবাদে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন থেকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ট্রান্সফার হয়। তার সরলতা, সামাজিকতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, ভাই বোন এবং আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি উদারতায় সকলের নয়নের মনি হয়ে ওঠে অতি সহজে।
যদিও তেমন দেশের বাড়ি যাওয়া হতো না, একবার গেলে সকল বোনকে ডেকে একসাথে একটা বা দুইটা দিন কাটাতেন অতি আনন্দে। এমনভাবে সময় কাটাতেন ভাই-বোনদের সাথে মনে হয় কৈশোরে ফিরে গেছে। মাঝে মাঝে আমার বাসায় আসলে আমার ছেলের সাথে আড্ডায় মেতে উঠতো, কথা বলতো তার শৈশব-কৈশোর, কর্মজীবন, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে।
যেহেতু আমার ছেলেও খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করেছে। সেহেতু কাকা হিসেবে তার ভাতিজাকে অনেক উপদেশ দিতেন কিভাবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অন্যায়ের কাছে আপোষ করেনি কখনো। তাইতো অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন সংসার জীবনে। প্রথম শ্রেণীর একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্তেও বিলাসিতা ছিল না তার মাঝে। দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকার কারণে কখনো অনৈতিকভাবে কাউকে কোন সুবিধা দেয়নি।
যার কারণে তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো অনৈতিক ভাবে সুবিধাবঞ্চিত কিছু জানোয়ারের হাতে। কত বড় হিংস্র নিষ্ঠুর জানোয়ার হলে এইভাবে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান প্রকৌশলীকে হত্যা হতে পারে নির্মমভাবে।
আমি হারিয়েছি ভাই, সন্তান হারিয়েছে পিতা ইস্ত্রি হারিয়েছে তার স্বামী, আর দেশ হারিয়েছে একজন সুদক্ষ দেশ গড়ার কারিগর। তাকে হারিয়ে আমি এবং আমাদের পরিবার যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, তার শতগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ। কর্মজীবনে পরিবারকে সে যতটুকু দিয়েছে তার শতগুণ বেশি দিয়েছে দেশকে। তাই প্রতিটি সচেতন মানুষের কাছে আমার আকুল আবেদন।
তার হত্যার বিচারের দাবীতে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গণ জোয়ার তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। তাহলে উপর মহলের দৃষ্টিগোচর হবে। ভাইকে ফেরত পাবোনা জানি, অন্তত সুবিচার পেলে তার বিদেহী আত্মার কিছুটা হলেও শান্তি হবে। ক্ষমা করবেন অনেকক্ষণ ধৈর্য সহকারে পড়ার জন্য।

প্রতিবাদ তুলুন, আপনার প্রতিবাদ মূলক লেখা পোস্ট করুন আমাদের গ্রুপে

Community of Engineers & Engineering Students (CEES)-BD
ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেনের নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচার করতে হবে
একজন মানুষকে দিনে-দুপুরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা যায়, একথা ভেবেই লজ্জিত হই, ঘৃণায় শঙ্কিত হয়ে পড়ি। কোথায় চলেছি আমরা?
ততোধিক শঙ্কিত ও বিচলিত হই মিডিয়াসহ সরকার ও রাস্ট্রযন্ত্রের নিস্ক্রিয়তায়। উচ্চপদস্থ একজন সরকারী কর্মকর্তা হত্যাকান্ডের শিকার হ’লেন অথচ সবাই নির্বিকার। প্রকৌশলীদের সংগঠন আছে বেশ কিছু, তাঁরাই বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিবাদ করছেন। “ করোনা” মহামারীর জন্যই কি এমন চুপচাপ সবাই?
আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সাথে কথা বলেছি। প্রায় সবারই গা-সারা ভাবের এক উত্তর, “ ইঞ্জিনিয়ার তো, হয়ত ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে গন্ডগোল ছিল’। সত্যি তাই? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, অনৈতিক ভাগাভাগি ছিল। তবুও একজন মানুষকে এমন ভাবে মেরে ফেলতে হবে?
আমরা যাঁরা এ পেশার সাথে জড়িত তাঁদেরও ভেবে দেখার সময় এসেছে। কেনো ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পর্কে মানুষের এমন ধারণা বা “পাবলিক পারস্পেশন”?
অগাধ দুর্ণীতিতে নিমজ্জিত একটি দেশে অসংখ্য সৎ ইঞ্জিনিয়ার আছেন, দেলোয়ার হোসেনের মতোই। অথচ দুর্ণীতিবাজদের অপকর্মের জন্যে সৎ ইঞ্জিনিয়ার এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমাজের মানুষের অন্যরকম দৃষ্টিভংগী। এই অপবাদ থেকে ইঞ্জিনিয়ারদের বেরিয়ে আসতে হবে নিজেদের স্বার্থেই। ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠনগুলোকেও নিজেদের সংগঠনের সদস্যদের আত্মশুদ্ধির পথকে উৎসাহিত করতে হবে।
আমি সম্প্রতি একটি গল্প লিখেছি “স্যার-দের গল্প” নামে, আমারই গল্পের সাইট “ উত্তরের গল্প”-এ। সত্য ঘটনাভিত্তিক এ গল্পটিতেও বলতে চেষ্টা করেছি, কিভাবে একটি দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী যাঁরা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার , তাঁদের মাথায় কাঁঠাল রেখে অন্যান্য পেশার লোকজন দিব্যি কাঁঠাল খেয়ে যায়। অথচ বদনাম হয় ইঞ্জিনিয়ারদের।
দেলোয়ার হোসেনের মতো অসংখ্য সৎ ইঞ্জিনিয়ারদের অসহায়ত্ব দেখেছি। চাকুরী ছেড়ে বাইরে চলে যেতে দেখেছি। আমার এক বন্ধুকে দেখেছি সবচেয়ে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের চাকুরীতে নিজের সততার জন্য টিকতে পারেনি। চাকুরী ছেড়ে দেশের বাইরে এসে হতাশায় ভুগে ভুগে আধা-পাগল হয়ে দেশে ফিরে এসে বাকীটা জীবন কাটাচ্ছে আত্মীয়স্বজনের গলগ্রহ হয়ে। কারণ, বাংলাদেশে সৎ মানুষের বেঁচে থাকা বড় কষ্টের । এমন সর্বগ্রাসী অনাচার, অবিচার আর দুর্ণীতিতে ছেঁয়ে গেছে দেশ।
একজন অতি সৎ ও কর্মদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেনের হত্যাকান্ডের বিচার না-হলে দেশের শব্দ-ভান্ডার থেকে “সততা”ও “বিচার” শব্দগুলো উঠিয়ে দিন।
ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে
আবারও এই হত্যাকান্ডের দ্রুত সুষ্ঠ তদন্ত ও বিচার দাবী করছি।___________________ Bhajan Sarker
মুশফিকুরের ব্যাট আর মাশরাফির ব্রেসলেট নিলামে বিক্রি ভাইরাল হয়েছে। প্রিয় মানুষকে নিয়ে মানুষের ইমোশন থাকবে, উন্মাদনা থাকবে- স্বাভাবিক। কিন্তু এরি মাঝে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে, শিরদাড়া উঁচু রাখতে গিয়ে- ঘুষ ফিরিয়ে দিতে গিয়ে- দেশের একজন সৎ প্রকৌশলী দেলোয়ার খুন হয়ে গেলেন। একশো কোটি টাকার ফাইল আটকে থাকায় তাকে হত্যা করেছে প্রভাবশালী ঠিকাদারেরা।
এই খবরটি ভাইরাল হবে দূরের কথা – কোনো জোরালো প্রতিবাদ পর্যন্ত হয়নি। এ কেমন আত্মঘাতি সমাজে বাস করছি আমরা। বুয়েটে পড়ালেখা করা কি কোনো সহজ কথা। কত বছরের নিরবিচ্ছিন্ন অধ্যাবসায়ের পর একজন মেধাবি প্রকৌশলী, বিশেষ করে এরকম একজন আদর্শবান বিরল জুয়েল দেশে তৈরি হয়।
আজ যদি সরকারি আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা সত্যিকারের পড়ুয়া হতো , বিবেকবান হতো- তবে সরকারি ভালো না প্রাইভেট ভালো – ইত্যাদি বালখিল্য বিষয়ে বাকবিতণ্ডা না করে-একজন সৎ প্রকৌশলীর এরকম নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মুখরিত হতো।
আমরাও বিক্ষোভে ফেটে পড়তাম। না এর কিছুই হয়নি। ব্যাট আর ব্রেসলেটের নিলাম আমাদের মাঝে যত উন্মাদনা তৈরি করেছে তার এক কণা পরিমাণও হাহাকার, দুঃখ, বেদনা মানুষের মৃত্যু আমাদের মাঝে তৈরি করেনি। হয়তোবা করতো- যদি এই খুনের কোনো ক্লিপ কেউ ভিডিও করে ছেড়ে দিতো।
হয়তোবা হতো কোনো মানুষের মৃত্যু যদি নিলামে ওঠতো। জীবন এতো সস্তা হয়ে গেলো কেমন করে? যে দূর্নীতিবাজ সমাজের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলি, ঘুষবিহীন কর্মকাণ্ডের স্বপ্ন দেখি সেখানে সৎ সাহসের জন্য যদি কাউকে জীবন দিয়ে দিতে হয়, সন্তান এতিম হয়, স্ত্রী বিধবা হয়- আর মানুষ একটা প্রতিবাদ ও করেনা- সেই সমাজে অন্যরা সাহসী, আদর্শবান হবে কেমন করে! কে চাইবে সততার জন্য নিজের জীবনকে এভাবে মৃত্য পরোয়ানায় নাম লিখাতে? কে চাইবে ঘুষ না নেয়ার অপরাধে মৃত লাশ হয়ে এভাবে ঘাসের ওপর পড়ে থাকতে ।
অন্যায় করা যত বড় পাপ। নীরব হয়ে চুপ থাকা তার চেয়েও বড় পাপ। আমরা সবাই পাপী। মৃত প্রকোশলী দেলোয়ার, তাঁর বিধবা স্ত্রী আর শৈশবে পিতা হারানো দুই সন্তানের কাছে আমরা সবাই বড় অপরাধী।_____________________Arif Mahmud.




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*