শিক্ষিত নয় মেধাবী মানবীয় মানুষ প্রয়োজন




শিক্ষিত নয় মেধাবী মানবীয় মানুষ প্রয়োজন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হিটলারের নাজি-কন্সেনট্রেশন ক্যাম্পে, একজন ইহুদি বন্দির লেখা একটি চিঠি উদ্ধার হয়েছিলো। যে চিঠিটি সেই বন্দি মানুষটি তাঁর প্রিয় শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন।
প্রিয় শিক্ষক,
আমি একজন ভাগ্যবান। আমি হিটলারের কন্সেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে জীবিত অবস্থায় মুক্ত আকাশের নীচে পৃথিবীর বুকে ফিরছি। আমি হিটলারের নাজি কন্সেনট্রেশন ক্যাম্পে যে দৃশ্য দেখেছি তা সকলের দেখা উচিত:
আমি দেখেছি গ্যাস চেম্বার তৈরি হয়েছে শিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা।
আমি দেখেছি বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়েছে শিক্ষিত কেমিস্ট দ্বারা।
আমি দেখেছি শিক্ষিত ডাক্তাররা কিভাবে বাচ্চাদের বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছে।
আমি দেখেছি শিক্ষিত নার্সরা কীভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিয়েছে অসহায় মানুষ দের।
এতো স্রেফ বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ মাত্র। স্কুল, কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষিত হাজার হাজার মানুষকে আমি প্রতিদিন নির্বিচারে শিশু, মহিলা সহ অসহায় মানুষের কাতর আর্তি তে কর্ণপাত না করেও উল্লাসের সাথে মানুষ হত্যা করতে দেখেছি।
এসব কিছু দেখার পর এখন আমার শিক্ষার প্রতি সন্দেহ হয়। মনে হয় শিক্ষা অর্থহীন একটা বিষয়। তাই আপনার প্রতি আমার একান্ত অনুরোধ, আপনি আপনার ছাত্রদের কেবল পাঠ্যপুস্তক না পড়িয়ে ‘মানুষ’ হয়ে উঠতেও সাহায্য করুন। একটা জিনিস সর্বদা খেয়াল রাখবেন, আপনার শিক্ষায় যেন কোন শিক্ষিত দৈত্য, জ্ঞানী শয়তান, সর্বজ্ঞ মূর্খ তৈরি না হয়। লিখতে, পড়তে শিখে; জটিল জটিল অঙ্ক আয়ত্ত করে, বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কার করে যদি মানুষ হয়ে মানুষের উন্নতিই না করা সম্ভব হয় তাহলে কীসের শিক্ষা? দয়া করে লক্ষ্য রাখবেন ভবিষ্যত প্রজন্ম যেনো স্রেফ শিক্ষিত হওয়ার চেয়েও বড় কিছু হয়, ওরা যেনো ‘মানুষ’ হয়। মানুষ হওয়াই বড় বেশি প্রয়োজন।
নোট: আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত সনদধারী মানুষ দেখছি নানাভাবে সাধারন মানুষদের ক্ষতি করে চলছে নিছক মনের শাস্তি আর নিজ স্বার্থের প্রয়োজনে!!! সে মিছিলে যোগ দিচ্ছে বুঝে, নাবুঝে, কেবল স্রোতের সাথে আরামে চলার জন্য। আফসোস ওরা বুঝতে পারছে না যে ওদের পরবর্তি প্রজন্মের জন্য কেমন ভাংঙ্গা এবং অমানবিক একটি সমাজ ব্যবস্থা নিজের হাতে রেখে যাচ্ছি!!! যে সন্তানের জন্য এতোকিছু করছি (নানা ভাবে, নানা উপায়) পাশাপাশি তাদের বসবাস অযোগ্য একটা প্রলয় রেখে যাচ্ছি অথচ অর্থ সম্পদের চেয়ে ঢের প্রয়োজন একটা মানবিক সমাজ!!!!
শিক্ষাতো সেটাই হওয়া বা দেয়া প্রয়োজন!!!!
নোট২: আহমদ ছফাকে ক’জন চি‌নেন? কে এই আহমদ ছফা?
একবার খালেদা জিয়া আহমদ ছফাকে ফোন করে দাওয়াত করেছিলেন। তিনি বেগম জিয়াকে বলেছিলেন, যেতে পারি এক শর্তে। আমাকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে হবে। শেখ হাসিনার কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে রান্না করে খাইয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার রান্না করার সময়ও হয়নি, ছফাও আর যাননি।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছফার আরেকবার ফোনালাপ হয়েছিল। উপলক্ষ ছিল এনজিও ব্যুরো থেকে ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’র রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে। ছফাই বেগম জিয়াকে ফোন করেছিলেন। ফোনটি ধরেছিলেন তাঁর পিএস। ছফা বিনয়ের সঙ্গে পিএ কে বলেছিলেন, ম্যাডামকে কি একটু দেয়া যাবে? আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
পিএ সাহেব জানতে চাইলেন, আপনি কে?
ছফার জবাব, আমি আহমদ ছফা।
পিএ সাহেব ফের জানতে চাইলেন, কোন আহমদ ছফা?
পিএস এর কথায় ছফা ভয়ানক রকম খেপে গিয়েছিলেন। তিনি রাগলে সচরাচর যে গালটি তাঁর মুখ দিয়ে বের হতো সেটি বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি কোন রকম ভূমিকা না করে বললেন, বাংলাদেশে আহমদ ছফা দু’জন আছে নাকি?
ছফা কথা না বাড়িয়ে রিসিভারটি ধপাস করে রেখে দিয়েছিলেন।
পিএ সাহেব ছফার এ অশোভন আচরণের কথা বেগম জিয়াকে জানিয়েছিলেন কিনা জানা যায়নি। কিছুক্ষণ পরে বেগম জিয়া ফোন করেছিলেন। ছফার কথার ঝাঁঝ তখনও থেকে গিয়েছিল। ফোন পেয়ে তিনি বেগম জিয়াকে বিরক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ম্যাডাম, কী সব অশিক্ষিত পিএ টিএ রাখেন, আহমদ ছফার নাম জানে না!
আহমদ ছফার কথায় বেগম জিয়া হেসে জবাব দিয়েছিলেন,আমি নিজে অশিক্ষিত; শিক্ষিত মানুষ পাব কোথায়! আপনারা কেউ তো এগিয়ে আসছেন না?
বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলায় কলকাতার বই আসতো। আহমদ ছফা এর বিরোধীতায় নামেন। তার বিরোধীতার ফলে কলকাতার বই আসা বন্ধ হয়। ছফা কাজটা করেছিলেন দেশের লেখকদের কল্যাণের জন্য কিন্তু এদশেরই লেখক শওকত ওসমান তাকে বাজে লোক বলে মন্তব্য করেন।
এরপর আহমদ ছফা তাঁকে নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে দোকানে নিয়ে যান। গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, শওকত ওসমানের কোন বই আছে কি-না।
লেখককে কেউই চিনতে পারলো না। তখন কলকাতার একজন সাধারণ মানের লেখকের নাম বলতেই অনেকগুলো বই বের করে দিলো। আহমদ ছফা তখন শওকত ওসমানকে বললেন,
দেশটা আমরা বাল ছেঁড়ার জন্যে স্বাধীন করেছি?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একবার আহমদ ছফা‌কে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রদূত হওয়ার জন্যে। কিন্ত তিনি (বঙ্গবন্ধু) যখন বললেন শর্ত আছে, তখন আহমদ ছফা বলেছিলেন, শর্ত ছফার জন্য নয়, আপনি অন্য কাউকে দেখুন।এতে শেখ মুজিবর অত্যন্ত রুষ্ট হন। পরবর্তীতে তাকে অনুরোধ করেছিলেন, শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ার জন্যে।
আহমদ ছফা বলেছিলেন সম্ভব নয়। আমাকে ধারণ করার মতো শক্তি আপনার সরকার বা আপনার প্রশাসনের নেই।
হুমায়ূন আহমেদসহ কয়েকজন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, কেউ বিয়ে করবেন না। সবাই বিয়ে করেছিলো এক আহমদ ছফা ছাড়া। তিনি চিরকুমারই ছিলেন।
বাংলা সাহিত্যে এপর্যন্ত যত প্রাবন্ধিক,লেখক এবং সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন তন্মধ্যে আহমদ ছফাই সবচেয়ে সাহসী,বুদ্ধিমান,কুশলী,বহুমুখী, সাধারণ এবং তেজময়। নির্লোভ মননশীলতা এবং সত্যসমৃদ্ধ স্পষ্টবাদিতার জন্য তাঁকে ভয় পেতেন সে সময়ের সাহিত্যিক,বুদ্ধিজীবিগণ।
কেউ যদি কয়েক পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ পড়ে কোনো বিষয়ে নিবিড় জ্ঞান অর্জন করতে চান তাহলে তার জন্য সহজ ও বিচক্ষণ উপায় হচ্ছে আহমদ ছফার প্রবন্ধ পাঠ।
যিনি সব সময় সত্য কথা বলতে ভয় পেতেন না এবং সকল অন্যায় এর প্রতিবাদ করতেন। এই সেই ছফা যিনি স্বাধীনবাংলাদেশে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ এর পরিবারকে গৃহহীন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
দুঃখ হয় কারণ,আহমদ ছফার খবর রাখে এমন মানুষ খুব বেশি নেই।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে সমরেশ মজুমদার এর খবর যতজন রাখে তার সিকি ভাগও ছফাকে চেনে কিনা সন্দেহ।
২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থনে সমাহিত করা হয়।
ভিন্নধারার এই কবি, প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক আজীবন অবৈষয়িক ছিলেন। ইনি বাংলা মটরে ভাড়া বাসায় একাকী থাকতেন। একজন ওনাকে রান্না করে দিতেন। ওনার অনেক ভক্ত ছিলো। সমসাময়িক কবি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবিগণ ওনার কাছে আসতেন। শাহবাগের আজিজ সুপারে সাহিত্য আড্ডার জন্যে একটি দোকান ভাড়া নিয়েছিলেন। জার্মান ভাষা শেখানোর একটি স্কুলও খুলেছিলেন। সফল হননি, আড্ডা পর্যন্তই সাড়।
হুমায়ুন আহমেদকে তিনি বলেছিলেন, আপনি শুধু টাকার জন্যে লিখলে আমাকে বলবেন, যে করেই হোক আমি জোগাড় করে দিবো, তবু যুবকদের নষ্ট করবেন না। তিনি জার্মান সাহিত্যিক গ্যাটের একটি বই ফাউস্ট অনুবাদ করেছিলেন অনেক আশা নিয়ে যে বাঙ্গালীরা জার্মান সাহিত্য ও গ্যাটেকে জানবে। তিন বছরে বইটির মাত্র চার কপি বিক্রি হয়েছিলো। এর একটির ক্রেতা তিনি নিজেই। ছফা ঠিকমতো বাসা ও দোকান ভাড়াও দিতে পারতেন না। মারা যাওয়ার পর ওনার কবরের জায়গা ব্যবস্থা হয়নি কারণ তিনি কোনো টাকা রেখে যাননি। পরে এক বন্ধু টাকা দিলে বুদ্ধিজীবীতে ওনার কবর হয়।
মৃত্যুর পর মরণোত্তর একুশে পদক সহ কতো মর্যাদা! এখন ছফার বই কিনতে যান দেখুন কতো মূল্য আর দুষ্প্রাপ্য। আমরা জীবিত প্রতিভাকে লালন করি না।মরলে মায়া কান্না কাঁদি। ওনার একটি বই “যদ্যপি আমার গুরু” যেভাবেই পারেন যোগাড় করে পড়বেন।
যেহেতু ইনি সংসার পাতেননি, জগৎসংসারে ওনাকে স্মরণ করারও কেউ নেই। ওনাকে স্মরণে আনা আমাদের দায়িত্ব। আর তা হলো ওনার লেখা পাঠ করা ও আদর্শকে লালন করা।
ওনার একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি,
“ কাউকে জ্ঞান বিতরণের আগে জেনে নিও যে তার মধ্যে সেই জ্ঞানের পিপাসা আছে কি-না!
অন্যথায় এ ধরণের জ্ঞান বিতরণ করা হবে এক ধরণের জবরদস্তি। জন্তুর সাথে জবরদস্তি করা যায়, মানুষের সাথে নয়।হিউম্যান উইল রিভল্ট। ”
সংগৃহিত।




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*