বিপ্লবী কল্পনা দত্ত।।জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা !!




বিপ্লবী কল্পনা দত্ত।। বিনম্র শ্রদ্ধা
বিপ্লবী কল্পনা দত্ত।। বিনম্র শ্রদ্ধা

বিপ্লবী কল্পনা দত্ত।।জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা !!

“তোমার ‌চি‌ঠিখা‌নি পে‌য়ে খু‌শি হলুম। অনেক‌দিন প‌রে মু‌ক্তিলাভ ক‌রেছ—এখন দি‌নে দি‌নে শা‌ন্তি ও শ‌ক্তিলাভ ক‌রো, এই কামনা ক‌রি। দে‌শে অনেক কাজ আছে, যা অচঞ্চল ও সমা‌হিত চি‌ত্তে সাধন করবার যোগ্য । দুঃখ‌ভো‌গের অভিজ্ঞতা তোমার জীব‌নে পূর্ণতা দান করুক, এই আমি আশীর্বাদ ক‌রি।”
১৯৩৯ সা‌লের চ‌ব্বি‌শে জুন এই চি‌ঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চি‌ঠির প্রাপক চট্টগ্রা‌মের কল্পনা দত্ত (২৭ জুলাই, ১৯১৩ — ৮ ফেব্রুয়া‌রি, ১৯৯৫); যে মে‌য়ে চট্টগ্রাম যুব বি‌দ্রো‌হে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবী কর্মী হিসা‌বে ছ’বছর (১৯৩৩ – ১৯৩৯) পু‌লি‌শের হেফাজত এবং বাংলার বি‌ভিন্ন প্রা‌ন্তের জে‌লে বন্দি থে‌কে অব‌শে‌ষে মু‌ক্তিলাভ ক‌রেন।
প‌রিবা‌রের দেওয়া নাম কল্পনারা‌নি দত্তগুপ্ত। ম্যা‌ট্রিকু‌লেশন পরীক্ষার ফর্মে নি‌জের নাম লিখেছিলেন কল্পনা দত্ত, তারপর আমৃত্যু্ কল্পনা দত্ত (‌যোশী) না‌মেই তি‌নি প‌রি‌চিত। ১৯২৯ সা‌লে চট্টগ্রা‌মের ডঃ খাস্তগীর ইং‌লিশ হাইস্কুল ফর গার্লস থে‌কে ম্যাা‌ট্রিকু‌লেশন পাশ ক‌রে পড়‌তে আসেন কলকাতার বেথুন ক‌লে‌জে, থাক‌তেন ক‌লেজ সংলগ্ন বেথুন হস্টেলে। সেসম‌য় যোগা‌যোগ হয় বেথু‌ন ক‌লে‌জেরই ছাত্রী কল্যাুণী দাশ‌ ও তাঁদের সংগঠন ‘ছাত্রী সংঘ’-র সা‌থে। কল্পনা দত্ত সিমলা ব্যাায়াম স‌মি‌তির আখড়ায় লা‌ঠি‌খেলা, ছোরা‌খেলা, যুযুৎসু শেখাও শুরু ক‌রেন। বেথুন ক‌লে‌জে গঠন ক‌রেন ছাত্রী স‌মি‌তি। বেথুন ক‌লে‌জে পড়ার সম‌য়েই যোগা‌যোগ হয় বিপ্লবী পূ‌র্ণেন্দু দ‌স্তিদার, ম‌নোরঞ্জন রায়‌দের স‌ঙ্গে।
বিপ্লবী কল্পনা দত্ত।।জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা
১৯২৯ সাল থে‌কেই কল্পনা দত্ত বিপ্লবী রাজনী‌তি‌তে স‌ক্রিয় হন। ১৯৩০-এর এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযান হয়। মে মা‌সে গর‌মের ছু‌টি‌তে কল্পনা কলকাতা থে‌কে চট্টগ্রা‌মে ‌দে‌শের বা‌ড়ি‌তে চলে যান। সেখা‌নে এলাকা ধ‌রে বিপ্লবী কাজকর্ম শুরু ক‌রেন। কলকাতা থে‌কে ট্রান্সফার নি‌য়ে ভ‌র্তি হন চাটগাঁর ক‌লে‌জে। বছরখা‌নেক পর, ১৯৩১-এর জু‌নে, তাঁর স‌ঙ্গে বিপ্লবী সূর্য সে‌নের প্রথম দেখা হয়। তখন ‌জে‌লে বন্দি গ‌ণেশ ঘোষ, অনন্ত সিং সহ বিপ্লবী‌দের জে‌লে ভে‌ঙে মুক্ত করার প‌রিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কল্পনা দত্ত ছদ্ম‌বে‌শে জেলবন্দি বিপ্লবী‌দের স‌ঙ্গে দেখা কর‌তে যে‌তেন এবং কল্পনা দ‌ত্তের মাধ্যমেই জে‌লের বাইরে থাকা মাষ্টারদারা জেলবন্দি অনন্ত সিং-দের স‌ঙ্গে যোগা‌যোগ রাখ‌তেন।
১৯৩১ সা‌লেই ‘ডিনামাইট ষড়যন্ত্র’ মামলায় স‌ন্দেহভাজন হিসা‌বে পু‌লিশ তাঁর গ‌তি‌বি‌ধি নিয়ন্ত্রণ ক‌রে গৃহবন্দি ক‌রে রা‌খে। পু‌লি‌শের চো‌খে ফাঁ‌কি দি‌য়ে কল্পনা রা‌তের অন্ধকা‌রে পুরু‌ষের বে‌শে ‌বিপ্লবীদের আশ্রয়স্থ‌লে চ‌লে যে‌তেন। এরকম এক রা‌তে ১৯৩২-এর ১৭ সে‌প্টেম্বর পাহাড়তলী‌তে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন। তার এক সপ্তাহ প‌রেই প্রী‌তিলতা ওয়া‌দ্দেদার আর কল্পনা দ‌ত্তের পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রম‌ণের কথা ছিল। মাস দু‌য়েক প‌রে ডি‌সেম্ব‌রে জা‌মি‌নে মুক্ত হলে শুরু হয় কল্পনার আত্ম‌গোপন পর্ব। এই সময় বিপ্লবী তার‌কেশ্বর দ‌স্তিদা‌রের তত্ত্বাবধা‌নে শি‌খে নেন বোমা বানা‌নোর উপায়; বি‌স্ফোরক দ্রব্যের প্রস্তুতপ্রণালী। চট্টগ্রাম যুব বি‌দ্রো‌হের পর পু‌লিশ খ্যাপা কুকু‌রের ম‌তো মাষ্টারদা‌কে খুঁজ‌ছিল। ফ‌লে মাষ্টারদা সহ পু‌রো বিপ্লবী বা‌হিনীই আত্ম‌গোপন ক‌রেছি‌লেন। ১৯৩৩-এর ১৬ ফেব্রুয়া‌রি এক বিশ্বাসঘাত‌কের সহায়তায় গৈরালা গ্রাম থে‌কে পু‌লিশ গ্রেপ্তার ক‌রে মাষ্টারদা‌কে। এর তিন মাস প‌রে, ১৮ মে, ব‌ঙ্গোপসাগ‌রের তী‌রবর্তী গ‌হিরা গ্রা‌মের পূর্ণ তালুকদা‌র, প্রসন্ন তালুকদার‌দের বা‌ড়ি থে‌কে গ্রেপ্তার হন কল্পনা দত্ত।
স্পেশাল ট্রাইবুনা‌লের বিচা‌রে সূর্য সেন ও তার‌কেশ্বর দ‌স্তিদা‌রের ফাঁসির হুকুম হয়। কল্পনা দত্ত কমবয়সী মে‌য়ে ব‌লে আন্দামা‌নে দ্বীপান্ত‌রের আদেশ হয়। য‌দিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী‌দের উদ্যো‌গে দ্বীপান্ত‌রের আদেশ বা‌তিল হয়; রাজশাহী আর হিজলীর জে‌লে ছ’বছর কা‌টি‌য়ে ১৯৩৯-এর ১ মে মু‌ক্তি পান কল্পনা। তাঁর জে‌লে বন্দি থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নি‌জে গভর্নরের স‌ঙ্গে দেখা ক‌রে কল্পনার মু‌ক্তির আর্জি জানিয়েছিলেন; কল্পনার বাবা‌কে লিখেছিলেন, “তোমার কন্যার জন্যে যা আমার সাধ্য তা কর‌ছি, তার শেষ ফল জানবার সময় এখনও হয়‌নি; আশা ক‌রি, চেষ্টা ব্যর্থ হ‌বে না।” জেল থে‌কে মু‌ক্তি পে‌য়ে কল্পনা রবীন্দ্রনাথ‌কে ধন্যবাদ জা‌নি‌য়ে চি‌ঠি লে‌খেন এবং প্রত্যুেত্ত‌রে রবীন্দ্রনাথ কল্পনা‌কে আশীর্বাদ জা‌নি‌য়ে যে চি‌ঠি‌টি লিখেছিলেন তা লেখার শুরু‌তেই উদ্ধৃত করা হয়েছে। জে‌লের ম‌ধ্যে কল্পনা দত্ত, বীণা দাশ (‌ভৌ‌মিক) প্রমুখ রাজবন্দিরা রবীন্দ্রনা‌থের নাটক অভিনয় কর‌তেন।
জেল থে‌কে বে‌রো‌নোর প‌রে ১৯৪০ সা‌লে কল্পনা কলকাতা বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ে ভ‌র্তি হন। এই সম‌য়েই ভার‌তের ক‌মিউনিষ্ট পা‌র্টিতে যোগ দেন এবং বাংলার দু‌র্ভিক্ষের উপর পা‌র্টির প‌ত্রিকা ‘পিপলস্ ওয়ার’-এ রি‌পোর্ট লে‌খা শুরু করেন। জেল‌ফেরতা ক‌মিউনিষ্ট কর্মী ক‌ল্পনা‌কে ১৯৪০-এর ন‌ভেম্বর থে‌কে ১৯৪১-এর ডি‌সেম্বর পর্যন্ত গৃ‌হে অন্তরীণ ক‌রে রা‌খে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যমবাদীরা। ১৯৪৩ সা‌লে বো‌ম্বে‌তে ক‌মিউনিষ্ট পা‌র্টির স‌ম্মেল‌নে চট্টগ্রা‌মের প্রতি‌নি‌ধি হিসা‌বে যোগ দেন কল্পনা। এখা‌নেই পা‌র্টির সাধারণ সম্পাদক পূরণচাঁদ যোশীর স‌ঙ্গে আলাপ এবং বিবাহ। ১৯৪৬ সা‌লের নির্বাচ‌নে কল্পনা দত্ত ভার‌তের ক‌মিউনিষ্ট পা‌র্টির প্রতি‌নি‌ধি হিসা‌বে প্রতিদ্ব‌ন্দ্বিতা ক‌রেন এবং কল্পনা দ‌ত্তের বিরু‌দ্ধে চট্টগ্রা‌মে কং‌গ্রেসের নির্বাচ‌নী প্রচা‌রে এসে জওহরলাল নে‌হেরু ক‌মিউনিষ্ট‌দের আগা‌গোড়া সমা‌লোচনা ক‌রলেও তাঁদের প্রার্থী কল্পনা দত্ত‌কে ‘বাহাদুর লড়কী’ বল‌তে বাধ্য হন।
১৯৪৫ সা‌লে ইং‌রি‌জি‌তে প্রকা‌শিত হয় কল্পনা দ‌ত্তের স্মৃ‌তিকথা ‘Chittagong Armoury Raiders: Reminiscences’ (Bombay: People’s Publishing House) এবং প‌রের বছর জানুয়া‌রি‌তে বাংলায় প্রকা‌শিত হয় ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারী‌দের স্মৃ‌তিকথা’ (কলকাতা: বঙ্গীয় প্রা‌দে‌শিক ক‌মি‌টি, ভার‌তের ক‌মিউনিষ্ট পা‌র্টি, ১৯৪৬)। সে বছরেই কল্পনা পাকাপা‌কিভা‌বে দিল্লী চ‌লে যান। এরপর বি‌ভিন্ন সম‌য়ে কল্পনা দত্ত যুক্ত থে‌কে‌ছেন কলকাতা বিশ্ব‌বিদ্যালয় জাতীয় সংহ‌তি প‌রিষদ (NSS), বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রাম স্মৃ‌তি সংস্থা, জালালাবাদ শহিদ স্মরণ ম‌ঞ্চের স‌ঙ্গে। নতুন দিল্লীর রুশ ভাষা ইন্স‌টিট্যু‌টের চেয়ারপার্সন হিসা‌বেও কাজ ক‌রে‌ছেন এবং আমৃত্যু যুক্ত থে‌কেছেন ভার‌তের ক‌মিউনিষ্ট পা‌র্টির স‌ঙ্গে। পা‌র্টির দিল্লী ক‌মি‌টির সদস্য ছি‌লেন কল্পনা দত্ত (‌যোশী)। ১৯৯৫ সা‌লের ৮ ফেব্রুয়া‌রি এই বিপ্লবী-ক‌মিউনি‌ষ্টের জীবনাবসান হয়।
আজ কল্পনা দত্তের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।
লিখন: অপূর্ব রায়
আলোকচিত্র কৃতজ্ঞতা: সেন্টার ফর উইমেনস ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ, নিউ দিল্লী




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*