‘রুপকথার রানীর’ ঋণ-সরকারি জমি দেখিয়ে টিভি উপস্থাপিকা জাকিয়া তাজিনের ১৫০ কোটি টাকা লোপাট




‘রূপকথার রানীর’
‘রূপকথার রানীর’

‘রুপকথার রানীর’ ঋণ-সরকারি জমি দেখিয়ে টিভি উপস্থাপিকা জাকিয়া তাজিনের ১৫০ কোটি টাকা লোপাট

ব্যাংক খাতকে যদি একটি দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড ধরা হয়, তাহলে সেখানে রক্তক্ষরণ ঘটছে অনেক আগেই। গত দশ বছরে এ খাতে এমন সব দুর্নীতি প্রকাশ পেয়েছে, যা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপসহ ভুঁইফোড় অনেক কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে তা আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারে এবার এক ‘রূপকথার রানীর’ গল্প বের হয়ে এসেছে। যিনি ভুয়া মর্টগেজ দিয়ে আইএফআইসি এবং অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন, পাচারও করেছেন কোটি কোটি টাকা। তিনি এগ্রো ইনডেক্স লিমিটেডের Registered [ Reg. No. C-95416 ] ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিয়া তাজিন। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাকিয়া ব্যাংক দুর্নীতিতে ‘রূপকথার রানী’।

খোজ নিয়ে জানা যায়, জাকিয়া তাজিন আইএফআইসি ও অগ্রণী ব্যাংক ছাড়াও দেশের আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে নামে বেনামে অনেক লোন নিয়েছেন, খুলেছেন অনেক কোম্পানি। যা পরবর্তীতে কিনে নিয়েছেন এক শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী।

ছবি গ্যালারিঃ এই প্রতিবেদন তৈরিতে যেসব ডকুমেন্টস ব্যবহার করা হয়েছে। 

খোজ নিয়ে আরও জানা যায়, ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে এই নারী এখন পর্যন্ত কোন প্রকল্প তৈরি করেনি বরং দেশ বিদেশে ভ্রমণ করেছেন। একই সাথে সমাজের বড় বড় অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হয়েও হাজির হতে দেখা গিয়েছে জাকিয়া তাজিনকে।

জানা গেছে, ২০১২ সালে ১৯ জানুয়ারি অগ্রণী ব্যাংক প্রধান শাখা থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ আইএফআইসি ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ও মতিঝিল শাখা থেকে ১ শ’ ৪৪ কোটি টাকা ঋণ নেন জাকিয়া তাজিন। একই জমি দেখিয়ে দুই ব্যাংক থেকে এই ঋণ গ্রহণ করেন তিনি। যে মর্টগেজ দিয়েছেন তাও ভুয়া। সরকারি সম্পত্তি নিজের নামে দেখিয়ে এই ঋণ নেন। আবার যে প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়ে ঋণ গ্রহণ করেছেন, সেই প্রকল্পের ব্যয় মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা।

আইএফআইসি ও অগ্রণী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জাকিয়া যে প্রজেক্ট প্রস্তাবনা দেখিয়ে টাকা নিয়েছেন, তার সঙ্গে বাস্তব অবস্থার মিল নেই। ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র পুণরায় যাছাই করতে গিয়ে দেখেন, তার সবই ভুয়া। যে জমি মর্টগেজ দিয়েছেন তা পটুয়াখালীর মহীপালের আলীপুরে। কিন্তু জমির মালিক তিনি নন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি। এই জমি মর্টগেজ রেখে প্রকল্পের জন্য টাকা নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত বন্ধকী কাগজপত্র দেখানো হয়নি, যা ব্যাংক আইন পরিপন্থী। তাছাড়া প্রকল্পটি এখনও পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়নি। কিন্তু তিন বছর পূর্বেই ওয়ার্কিং মূলধন গ্রহণ করেছেন।

গত এক দশকে ব্যাংক খাত থেকে জালিয়াতি হয়েছে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। যেখানে অনেক ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ে হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। নিয়ম না মেনে ঋণ বিতরণ, বেনামি ঋণ, সুশাসনের অভাব- এসবই ব্যাংক খাতের সামগ্রিক চিত্র। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ক্যানসারের মতো, একবার দেখা দিলে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা অর্থনীতিতে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক প্রকল্পের জন্য অর্থ নিয়ে জাকিয়া অন্য প্রকল্পে সে অর্থ বিনিয়োগ করে টাকা পাচার করেছেন। যেমনটি করেছেন ইনডেক্স পাওয়ার লিমিটেড ১ ও ২ এ। এই কোম্পানির মূল মালিক তিনি। এছাড়া জেডটিআই ট্রেডিং কোম্পানির নামে মোবাইল ফোন আমদানির নামেও অর্থ পাচার করেন তিনি, যা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এগ্রো ইনডেক্স কোম্পানি’র মতো অখ্যাত অনেক কোম্পানি এভাবে ভুয়া ঋণ গ্রহণ করে ব্যাংক খাতকে অস্থির করে তুলেছেন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা অনুসন্ধান চালালেও শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালীদের কাছে ধরাশায়ী হন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, গত ১০ বছরে জনতা ব্যাংক থেকে অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপ মিলে ১১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে, বেসিক ব্যাংক থেকে চলে গেছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে আত্মসাৎ হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা, বিসমিল্লাহ গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে আরও ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

ঋণ দেওয়া ব্যাংক দু’টির অনুসন্ধানে ধরা পড়ে যে, এগ্রো ইনডেক্স কোম্পানি গঠনে ঢাকার মিরপুরের আসমা খাতুন নামের এক নারীর স্বাক্ষর জাল করেছেন জাকিয়া। ওই নারীকে কোম্পানির অংশীদার রাখা হয়েছে। অথচ আসমা খাতুন জানেন-ই না যে তিনি এই কোম্পানির অংশীদার।

এছাড়া জাকিয়া তাজিন তার বর্তমান বাসস্থান বাড়ি নং-৩৭, ৪র্থ ও ৫ম তলা, রোড-১২৩, গুলশান এভিনিউ, গুলশান -১ একই সাথে প্রথম আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ন্যাশনাল হাউজিং) এর কোনরূপ অনুমোদন ছাড়াই দ্বিতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকে একই ফ্লাট দেখিয়ে মর্টগেজ নেয়। এই মর্টগেজের কোন আপডেট নেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ইনডেক্স পাওয়ার এন্ড এনার্জি লিমিটেডের নকশা তৈরি বাবদ ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৭৮ কোটি টাকা নিয়েছেন। কোন প্রকল্পের নকশা বাবদ ব্যয়ের জন্য ১০ শতাংশ এর বেশি ঋণ নেওয়ার কোন নিয়ম নেই। এক্ষেত্রে ৩০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত নক্সার জন্য ৭৮ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, অথচ এতে ৩০ কোটি টাকার বেশি দেওয়ার বিধান নেই। এই কোম্পানি পরে বাংলাদেশের স্বনামধন্য একটি কোম্পানি কিনে নেয়।

জানা গেছে, নকশা তৈরি করতে ওই অর্থ তিনি সিঙ্গাপুরে কর্ড হোল্ডিং লিমিটেডের কাছে পাঠিয়েছেন। যে কোম্পানির নামে এই টাকা পাঠানো হয়েছে ওই কোম্পানির এই ধরনের কাজের কোন অভিজ্ঞতা নেই। কারণ, এটি প্রকৌশল কোম্পানি নয়। শুধু অর্থ পাচারের জন্য এই টাকা সেখানে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের এসআরও অনুযায়ী ডিজাইন ও ড্রয়িং ডিউটি যথাক্রমে ৩১ ও ৫৮ শতাংশ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এনবিআরকে ১ শতাংশ ডিউটিতে ডকুমেন্ট রিলিজ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে কর্ড হোল্ডিং লিমিটেডের পাঠানো কোন ধরনের নকশা দাখিল করেননি এনবিআরে। শুধু কয়েক বাক্স কাগজ পাঠানো হয়েছে যা কোনভাবেই প্রজেক্ট তৈরির সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়।

অর্থ পাচারের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, জেডটিআই ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে চীন থেকে মোবাইল ফোন আমদানির কথা বলা হলেও বাস্তবে এসেছে মোবাইল কেসিং। অথচ মোবাইল ফোন আমদানির নামে এর মধ্যে জাকিয়া তাজিন ২০ কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে বাংলাদেশে ব্যাংকের কাছে তথ্য আছে। জেডটিআই ট্রেডিং কর্তৃক আমদানিকৃত মোবাইল বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হয় না বলে জানা গেছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জাকিয়া তাজিনের কেনা কক্সবাজারের একটি জমির ট্যাক্স ফাঁকির বিষয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত করছেন দুদক কর্তৃপক্ষ।

কিভাবে জাকিয়া তাজিন একের পর এক লোন ও অর্থ পাচার করছেন এমনটা জানার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, ক্ষমতাসীনদের চাপ ছিলো। তারাই নিয়ম অনুযায়ী কাগজপত্র গ্রহণ করে নাই। আবার তদন্ত করতে গেলেই তারাই আবার জাকিয়া তাজিনের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে।

”আমার বাংলাদেশ” এর পক্ষ থেকে জাকিয়া তাজিনের মোবাইল ফোনে কয়েকবার ফোন করা হলে ও তিনি রিসিভ করেননি। তাছাড়া তাকে এসএমএস ও ইমেইলও করা হয় যার উত্তর এখনো আসেনি। উত্তর পাওয়া মাত্র আমরা জাকিয়া তাজিনের মন্তব্য যুক্ত করে দিবো।

উল্লেখ্য, জাকিয়া তাজিন এক সময় বাংলাদেশের নামকরা টিভি চ্যানেল ইটিভিতে অনুষ্ঠান উপস্থাপিকা হিসেবে কাজ করতেন। শেয়ার মার্কেটের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য ইটিভি থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একটি স্টুডিও ছিলো। সেই অনুষ্ঠানেরও উপস্থাপিকা ছিলেন জাকিয়া তাজিন। এ বিষয়ে তখনকার জাকিয়া তাজিনের এক সহকর্মী জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাকিয়া উপস্থাপিকা হিসেবে ভালো করছিলো। ইটিভিতে তার বেশ গ্রহণ যোগ্যতা ছিলো। ওই সময় জাকিয়া ইটিভির তার এক সহকর্মী পীরজাদা মনিরকে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে এক সাথে দুজনে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে জাকিয়া তাজিন বিটিভিতে এক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার সাথে যুক্ত আছেন বলেও জানান সেই সহকর্মী। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক কর্মকর্তা জানান, জাকিয়া এখানে উপস্থাপনা করার সময়ই বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা তৈরি হয়। আর তাই কাজে লাগিয়ে এক সময় তিনিও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খুলেন। আমার বাংলাদেশ প্রতিবেদক।।




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*